ওয়েবসাইটের মাধ্যমে উপার্জন

স্থায়ী উপার্জনের জন্য বর্তমান প্রযুক্তি নির্ভর বিশ্বে সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি মাধ্যম হলো ওয়েবসাইটের মাধ্যমে উপার্জন করা।

অনলাইনে আয়ের বিষয়টি এখনকার আধুনিক বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয় একটি টপিক। স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে চাকুরীজীবীরা পর্যন্ত অনলাইনে ইনকামের সুযোগ খুঁজতে থাকে কারণ অনলাইনের মাধ্যমে ডলার ইনকাম করা যায় যা বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর প্রেক্ষাপটে অনেক বড় অঙ্কের অর্থ হয়ে যায়। অনলাইনে ইনকামের দুটি পন্থা নিয়ে আমরা কমবেশি সবাই জানি, একটি চাকরি করা এবং আরেকটি হলো অনলাইনে ব্যবসা করা। যত দিন যাচ্ছে তত প্রযুক্তির উন্নয়ন হচ্ছে, ঠিক তেমনি আয় করার বিভিন্ন রাস্তা বের হয়ে আসছে। ওয়েবসাইট থেকে ইনকাম হলো এমনই একটি রাস্তা যেখান থেকে আপনি স্বল্প ইনভেস্টের মাধ্যমে সারা জীবন অর্থ উপার্জন করতে পারবেন। আজকের নিবন্ধে আমরা অনলাইন থেকে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে কিভাবে আয় করা যায় সে বিষয়ে বিস্তারিত জানব। তাহলে চলুন আর কথা না বাড়িয়ে আলোচনা শুরু করা যাক।

ওয়েবসাইট (Website) আসলে কি?

ওয়েবসাইট বলতে আমরা সাধারণত যা বুঝি তা হলো কোন নির্দিষ্ট ওয়েব সার্ভারে রাখা বিভিন্ন ধরনের ওয়েব পৃষ্ঠা, আপলোড কৃত ছবি, অডিও, ভিডিও ও অন্যান্য বিষয় যেমনঃ Infographic, GIP, Animation ইত্যাদি ডিজিটাল তথ্যের সমষ্টি। যা আমরা ইন্টারনেট ব্যবহার করে কম্পিউটার, স্মার্টফোন বা অন্যন্য স্মার্ট ডিভাইসের এর মাধ্যমে এক্সেস করে দেখতে পারি।

ইন্টারনেটে কোনো ওয়েবসাইট অ্যাক্সেস করাতে হলে আমাদেরকে নিচের ৩ টি ধাপ অনুসরন করতে হবে।

• প্রথমত, আমাদেরকে অবশ্যই একটি “ডোমেইন নেম রেজিস্ট্রেশন” করতে হবে, যেটা হতে হবে আপনি কি বিষয়ে ওয়েবসাইট তৈরি করবেন তার সাথে সম্পৃক্ত। যেমন : techtunes.com, news24.com, prothomalo.com ইত্যাদি।

• একটি ভালো মানের হোস্টিং কোম্পানি হতে পছন্দের প্ল্যান ও প্যাকেজ অনুযায়ী “ওয়েব হোস্টিং” কিনতে হবে। bluehost, namecheap, exonhost ইত্যাদি হোস্টিং কোম্পানি।

• সুন্দর করে ওয়েবসাইটে ডিজাইন করতে হবে। এর জন্য কোন ভালো থিম কেনা যেতে পারে অথবা এলিমেন্টার-প্রো(শুধুমাত্র ওয়ার্ডপ্রেসে ওয়েবসাইট তৈরীর ক্ষেত্রে), ওয়েব-ফ্লো ইত্যাদি প্ল্যাটফর্মও ব্যবহার করা যেতে পারে।

ওয়েবসাইট কেন তৈরি করা হয় এবং ওয়েবসাইট তৈরির উদ্দেশ্য কি?

এককথায়, ওয়েবসাইট বলতে বুঝায় অনলাইন পরিচিতি। সাধারণত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান (যেমন : স্কুল-কলেজ, বিভিন্ন কোম্পানির ওয়েবসাইট, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ইত্যাদি ) তাদের নামে ওয়েবসাইট তৈরি করে থাকে। এতে করে তারা সহজেই এবং খুব দ্রুত ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাদের বিভিন্ন সেবা এবং সার্ভিসগুলো দুনিয়ার যেকোন প্রান্তে থাকা মানুষের নিকট পৌঁছাতে পারে। এই জাতীয় ওয়েবসাইটগুলোকে মূলত প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইট বলা হয়।

প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইট ছাড়াও রয়েছে আরও প্রচুর ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক ওয়েবসাইট। এই ধরণের ওয়েবসাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে ভ্রমণ, পড়াশোনা, ব্যক্তিগত ব্লগ, বিনোদন, রান্না, খবর ইত্যাদি বিষয়ক ওয়েবসাইট। এই গুলোকে সাধারণত অ-প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইট বলা হয়। অনেক সময় এই ধরনের ওয়েবসাইটগুলো করা হয় নিছক সখের বসে অথবা, দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাবসা করার জন্য।

উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি লক্ষ্য করা যাক, যেমন ধরুন, “প্রথম আলো” বাংলা ভাষায় একটি জনপ্রিয় খবরের পত্রিকা। এদের নিজস্ব ওয়েবসাইট আছে যেখান থেকে এই পত্রিকা ইন্টারনেট ব্যবহার করে অনলাইনে পড়া যায়। এটি অবশ্যই একটি প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইট। অপরদিকে আমার নাম তন্ময় আর আমি যদি তন্ময় ডট কম(tonmoy.com) নামে কোন ওয়েবসাইট শুরু করি তাহলে সেটা অবশ্যই হবে অ-প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইট।

এখন প্রশ্ন হলো কিভাবে একটি ওয়েবসাইট বা ব্লগ থেকে অর্থ উপার্জন করা যায়?

ওয়েবসাইট বা ব্লগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যা দেখা যায় নতুনদের মাঝে। সোজা বাংলায় ব্লগ হচ্ছে এক ধরনের ওয়েবসাইট যেখানে নিয়মিত বিভিন্ন বিষয়ে(ভ্রমণ, কবিতা, অভিজ্ঞতা, পড়াশোনা ইত্যাদি) লিখালিখি করা হয়।

সেটা যে কোন বিষয়ই হতে পারে। অপরদিকে ওয়েবসাইটে লেখালেখির ব্যাপারটা তেমন থাকে না। তবে আপনি ওয়েবসাইট বা ব্লগ যেটাই করুন না কেন সেখান থেকে অবশ্যই আয় করা সম্ভব এবং এই আয় করার জন্য অনেকগুলো পদ্ধতি রয়েছে। চলুন পদ্ধতিগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক।

ওয়েবসাইট / ব্লগ থেকে অর্থ উপার্জন করার অনেকগুলো পদ্ধতি রয়েছে। কয়েকটি পদ্ধতি নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলঃ

১. অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং‌‌ : বর্তমান সময়ে ওয়েবসাইট বা ব্লগ থেকে ইনকাম করার একটি অন্যতম পদ্ধতি হলো অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং। এফিলিয়েট মার্কেটিং করে এত অর্থ উপার্জন করা সম্ভব যা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং অনেকটা সেলসম্যান-এর মত। এখানে, আপনি আপনার ওয়েবসাইট বা ব্লগের মাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানির পণ্য বিক্রি করবেন এবং প্রতিবার যখন আপনি পণ্য বিক্রি করবেন তখন আপনাকে সেই বিক্রয়কৃত অর্থ থেকে কমিশন দেয়া হবে। যাদের কাছে বিনিয়োগ করার মতো যথেষ্ট পুঁজি নাই তাদের জন্য অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং খুবই ভালো একটি পদ্ধতি।

২. বিজ্ঞাপন থেকে আয় : বিজ্ঞাপন থেকে আয় করতে হলে ওয়েবসাইটে অবশ্যই অনেক বেশি ভিজিটর (এখানে ভিজিটর বলতে আমরা যারা ওয়েবসাইট ব্যবহার করি) থাকতে হবে। যদি ভিজিটর না থাকে তাহলে কোন কোম্পানি কেন তার এড আপনার ওয়েবসাইটে দেখাবে, তাই না। সবারতো উদ্দেশ্য একটাই পণ্য বিক্রি করা। আর বিক্রেতারা সবসময় চিন্তা করে কিভাবে তার পণ্য অনেক বেশি ক্রেতার নিকট পৌঁছানো যায়।

আমরা যখন কোন ওয়েবসাইট ভিজিট করি তখন প্রায় সময়ই দেখা যায় বিভিন্ন কম্পানির বিজ্ঞাপন একটি ওয়েবসাইটের বিভিন্ন জায়গায় দেখানো হচ্ছে। এই বিজ্ঞাপনগুলো কিন্তু ফ্রিতে দেখানো হয় না। এর জন্য কোম্পানির মালিকরা ওয়েবসাইটের মালিক কে অর্থ দিয়ে থাকে। তারমানে আমরা যদি আমাদের ওয়েবসাইটে অনেক বেশি ভিজিটর আনতে পারি তাহলে অর্থের বিনিময়ে পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের ওয়েবসাইটে তাদের বিজ্ঞাপনগুলো দেখাবে।

এখন হয়তো আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এই সকল কোম্পানির বিজ্ঞাপন আমরা কোথা থেকে পাব? আসলে এই ধরনের বিজ্ঞাপনগুলো পাওয়ার জন্য অনলাইনে অনেক জনপ্রিয় সাইট আছে (যেমন- গুগল অ্যাডসেন্স)। এই সকল সাইট থেকে কিভাবে বিজ্ঞাপন নিতে হয় এবং কিভাবে সে বিজ্ঞাপন হতে আয় করতে হয় তার বিস্তারিত অনেক ভিডিও আমরা ইউটিউবে পেয়ে যাব। তাছাড়াও আমি পরবর্তী পোস্টে ইনকামের এই বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। যাতে করে আপনারা খুব সহজেই কাজগুলো বুঝতে পারেন এবং ওয়েবসাইট থেকে অর্থ উপার্জন করতে পারেন।

৩. ইমেইল কালেকশন : আমি আগেও বলেছি পণ্য বিক্রি করার জন্য আমাদের অবশ্যই মার্কেটিং প্রয়োজন আর তার জন্য বিজ্ঞাপনদাতারা সেসকল ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন গুলো দেন যে সকল ওয়েবসাইটে ভিজিটর অনেক বেশি থাকে। বর্তমান সময়ে ইমেইল মার্কেটিং অনলাইন ইনকামের খুব জনপ্রিয় একটি মাধ্যম। আপনার কাছে যদি অনেকগুলো ইমেইল আইডি থাকে তাহলে আপনি আপনার পণ্য সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য সেই মেইল আইডিতে পাঠাতে পারেন। যা আপনার পণ্যের মার্কেটিং এবং বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। আমরা সবাই বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে ছবি, ভিডিও, বই, গান, মুভি ইত্যাদি ডাউনলোড করে থাকি। অনেক সময় এই জিনিসগুলো ডাউনলোড করতে গেলে আমাদেরকে ওয়েবসাইটে ইমেইল আইডি দিয়ে অ্যাক্সেস করতে হয়। সে ক্ষেত্রে যেটা হয় আমাদের ইমেইল আইডিগুলো সে ওয়েবসাইটে জমা হয়ে থাকে। পরে যে সকল কোম্পানি ইমেইলের মাধ্যমে তাদের পণ্যের মার্কেটিং করে থাকে বা যারা অনলাইনে ইমেইল মার্কেটিংয়ের কাজ করে থাকে তাদের কাছে এই ইমেইল আইডি গুলো বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করা যায়।

ধরা যাক, একটি ওয়েবসাইটে ১০০০ ভিজিটরের ইমেইল আইডি ওই ওয়েবসাইটের মালিকের কাছে জমা হল। অর্থাৎ কোন পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান যদি এই ইমেইল আইডিগুলো ক্রয় করে তাহলে ১০০০ জন ভিজিটরের কাছে সে তার পণ্যের বিজ্ঞাপন পাঠাতে পারবে কারণ ইমেইল মার্কেটিং এর জন্য অ্যাক্টিভ ইমেইল আইডির প্রয়োজন হয়। ইন্যাক্টিভ ইমেইল আইডিতে মার্কেটিং করা তো কোনো লাভ নেই তাইনা। যে ইমেইল আইডি কেউ ব্যবহার করে না সেখানে পণ্যের মার্কেটিং দেখার তো কেউ নেই।তার মানে আপনি আপনার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ইমেইল আইডি সংগ্রহ করে এবং আইডিগুলো বিক্রি করে আয় করতে পারেন।

৪. নিজের কোন পন্য বিক্রি করে : আপনার ওয়েবসাইটটি যখন অনেক বেশী জনপ্রিয় হয়ে উঠবে তখন শুধু অন্যের পণ্য বিক্রি করে অথবা অন্যের পণ্যের বিজ্ঞাপন দিয়ে আয় করতে হবে ব্যাপারটা এমন না। আপনার নিজের কোন পণ্য থাকলে আপনি আপনার ওয়েবসাইটে সেই পণ্যের বিজ্ঞাপন ব্যবহার করে সেটি বিক্রি করতে পারেন। তবে এটি তখনই করা সম্ভব হবে যদি আপনার নিজস্ব কোন পণ্য থাকে নতুবা সম্ভব নয়। যেহেতু নিজের পণ্য তৈরি করতে অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে সুতরাং আমি বলবো প্রথমে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং দিয়ে শুরু করাটাই সর্বোত্তম হবে। তবে যাদের ইতোমধ্যে নিজস্ব পণ্য আছে কিন্তু কোন ওয়েবসাইট নেই তারা অবশ্যই সেই পণ্যের ওয়েবসাইট তৈরি করে বিক্রি করতে পারেন।

আশাকরি উপরের আলোচনায় ব্লগ বা ওয়েবসাইট থেকে আয়ের বিষয়টি সম্পর্কে আপনাদের স্পষ্ট ধারণা দিতে পেরেছি। তার পরেও যদি কারো কিছু জানার থাকে তাহলে কমেন্টে বলার জন্য অনুরোধ থাকলো। তবে ওয়েবসাইট থেকে আয় করতে হলে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে তা হলো ভিজিটর। ওয়েবসাইটে ভিজিটর না থাকলে সেই সাইট থেকে কোন ভাবে আয় করা সম্ভব নয়। আবার অপরদিকে একটি ওয়েবসাইটকে জনপ্রিয় করা খুব কঠিন কাজ নয়, প্রয়োজন ধৈর্য, পরিশ্রম এবং সময়ের। ভাল থাকবেন সবাই, আর পোস্টটি ভাল লাগলে লাইক কমেন্ট করবেন।

Leave a Comment